মঙ্গলবার । ১২ই মে, ২০২৬ । ২৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩

উপকূলে কাজের খোঁজে অনিশ্চয়তায় যুবসমাজ

তরিকুল ইসলাম

খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় বেকারত্বের সমস্যা দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত দুর্গম এ অঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠী অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ও যুব সমাজ কাজের অভাবে চরম দুশ্চিন্তায় ভুগছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কয়রায় একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) স্থাপনের দাবি জোরালো হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপজেলা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা একটি এলাকা। এখানকার অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষি, মৎস্য ও সুন্দরবন নির্ভর। নোনাপানির ঘেরের কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। জীবিকার তাগিদে বছরের বড় সময় ইটভাটায় কাজ করতে যায় অধিকাংশ মানুষ। তাদের পরিবারের সন্তানরা লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ছে। কর্মসংস্থানের অভাবে উচ্চ শিক্ষিত বহু নারী-পুরুষকে দিনমজুরের কাজ করতে হচ্ছে। সর্বোপরি যুবসমাজের একটি বড় অংশ বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা মাদক ও জুয়ায় আসক্ত হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, উপজেলায় কোনো সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই। স্থানীয় বহু শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্নসহ অনার্স-মাস্টার্স পাশ করলেও ব্যাবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে না। তারা তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও বাস্তব দক্ষতার অভাবে চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়ছেন। এছাড়া প্রশিক্ষণের অভাবে আত্ম-কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এসব যুবক-যুবতীরা।

বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো, কয়রা উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি জিএম মোনায়েম বলেন, “কয়রার মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বেকারত্ব এখন মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছে এবং শিশুশ্রম বাড়ছে।”

উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, “দুর্যোগের ফলে প্রায় প্রতি বছর কয়রায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু মাটির কাজ করতে স্কেভেটর চালক বাইরে থেকে আনতে হয়। একইভাবে কার্পেটিং সড়ক নির্মাণের জন্যও দক্ষ কর্মী ও রোলার চালক বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়। অথচ প্রশিক্ষণের অভাবে কয়রার মানুষ কর্মহীন। এজন্য স্কেভেটর ড্রাইভিং, রোলার ড্রাইভিং, গাড়ি মেরামতসহ আইটি খাতে প্রশিক্ষণ চালু করা গেলে একদিকে যেমন স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে দুর্যোগ-পরবর্তী অবকাঠামো পুনর্গঠনের কাজও দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এতে সময় ও ব্যয় উভয়ই সাশ্রয় হবে।

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার কারণে কৃষি এবং মৎস্য খাত বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কয়রার অধিকাংশ পরিবার জীবিকার সংকটে পড়েছে। তাদের টেকসই আয়ের পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ জীবিকার তাগিদে এলাকা ছেড়ে ইটভাটা ও বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক কাজে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে পরিবারে বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে এবং অনেক শিশু শিক্ষার ধারাবাহিকতা হারিয়ে ঝরে পড়ছে।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “কয়রায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার জন্য বিএমইটি কর্মকর্তারা সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেছেন।”

স্থানীয় সংসদ সদস্য মোঃ আবুল কালাম আজাদ বলেন, “উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। কয়রায় একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি জানান, “দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং এটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে।”

প্রসঙ্গত, স্থানীয় জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক কাজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে বিএমইটি-এর আওতাধীন ‘উপজেলা পর্যায়ে ৫০টি টিটিসি স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন কয়রা উপজেলায় সম্ভাব্য টিটিসি নির্মাণের স্থান পরিদর্শন করেছেন এবং গুরুত্ব উল্লেখ করে প্রস্তাবনা জমা দিয়েছেন।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন